বাংলার বুকে বয়ে চলা নদীগুলোর মধ্যে কপোতাক্ষ যেন এক নীরব কবি—যার ভাষা জল, যার উচ্চারণ ঢেউ। বহু যুগ ধরে সে শুধু প্রবাহিত হয়নি, সে লিখেছে সময়ের গল্প, মানুষের হাসি-কান্না আর স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস।
ভোরের প্রথম আলো যখন কপোতাক্ষের বুকে এসে পড়ে, তখন নদীটা যেন সোনালি স্বপ্নে মোড়া এক বিস্ময়। দুপুরের রোদে তার জল চিকচিক করে ওঠে, আর গোধূলির নরম আলোয় সে হয়ে ওঠে এক নিঃশব্দ চিত্রকর্ম।
দুই তীরের সবুজ গাছপালা, হালকা বাতাসের ছোঁয়া—সব মিলিয়ে কপোতাক্ষ যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব কবিতা। এই সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়েই কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর অমর কবিতায় কপোতাক্ষকে বেঁধে রেখেছিলেন শব্দের মালায়।
তাঁর কলমে নদীটি শুধু জলধারা নয়, হয়ে উঠেছিল স্মৃতির, আবেগের আর মমতার প্রতীক। কপোতাক্ষের পাড়ে জীবন যেন অন্যরকম ছন্দে বয়ে যায়। জেলের জালে ধরা পড়ে নদীর গল্প, কৃষকের মাঠে ফসল হয়ে ফোটে তার আশীর্বাদ।
নৌকার দোলায় ভেসে আসে গ্রামীণ জীবনের সুর, আর নদীর পাড়ে বসে মানুষ খুঁজে পায় এক চিরন্তন প্রশান্তি।কিন্তু সময়ের স্রোতে আজ কপোতাক্ষও যেন কিছুটা ক্লান্ত। পলি জমে তার গভীরতা কমে গেছে, দূষণে হারাচ্ছে তার স্বচ্ছতা। তবুও সে বয়ে চলে—নিঃশব্দে, নিরলসভাবে—যেন আশা করে, কেউ আবার তার সৌন্দর্য ফিরিয়ে দেবে আগের মতো।
কপোতাক্ষ তাই শুধু একটি নদী নয়—এটি এক অনুভূতি, এক চিরন্তন সুর, এক জীবন্ত কবিতা। তাকে ভালোবাসা মানে নিজের শিকড়কে ভালোবাসা, নিজের ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরা।
লেখক: ওরাইনা খাঁন চৌধুরী, শিক্ষার্থী গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।