গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: বাহুল্য বনাম বাস্তবতা

Site Favicon প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০২৬ ১৪:১৬
A+A-
Reset

গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় গণমাধ্যমকে। সমাজের দর্পণ হিসাবে কাজ করে সংবাদ মাধ্যম। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (RSF) এর ২০২৫ সালের সূচকে স্বাধীন গণমাধ্যমের সূচকে  ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার মাসে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নাতীত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কর্তব্যরত তরুণ সংবাদকর্মীদের মতামত পাঠকদের জন্য তুলে ধরছেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সংবাদকর্মী শামীম রেজা।

অপতথ্য সাংবাদিকতার পরিবেশ নষ্ট করছে:

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের স্বাভাবিকতা অব্যাহত রাখতে অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিংবা অনলাইন নিউজ পোর্টালের মাধ্যমে অপতথ্য, ভুয়া খবর, গুজব কিংবা ভালোভাবে যাচাই-বাছাই ছাড়া দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে দেওয়াটা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে ব্যাহত করে। পাঠকের বিশ্বাসযোগ্যতাকে অনেকখানি কমিয়ে দেয়৷ এতে করে সাংবাদিকদের ট্রল বা হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়। অনেকে এসবের ভীড়ে স্বাধীনভাবে পেশাদারিত্বের সাথে সাংবাদিকতা করার মনোবল ও উদ্যম হারিয়ে ফেলেন। যা সাংবাদিকতার সামগ্রিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মাহ্ আলম
সভাপতি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (জাবিসাস)

বহুমাত্রিক স্বাধীনতার কেন্দ্রেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা:

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জ্ঞান ও শিক্ষার স্বাধীনতা, পেশা ও কর্মসংস্থানের স্বাধীনতা, সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধনের স্বাধীনতা, ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠানের স্বাধীনতা, সামাজিক অংশগ্রহণের স্বাধীনতা-স্বাধীনতার রূপ বহুমাত্রিক, বিস্তৃত, আর গভীর। এই প্রতিটি স্তর মিলেই গড়ে ওঠে মানুষের স্বতন্ত্র সত্তা, তার ভাবনা ও প্রকাশের পরিসর। আর এই বহুমাত্রিক স্বাধীনতার কেন্দ্রে, এক ধরনের নীরব কিন্তু নির্ধারক শক্তি হিসেবে অবস্থান করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মূলত জ্ঞান উৎপাদন, যাচাই এবং প্রচারের একটি নৈতিক কাঠামো। এটি নিশ্চিত করে যে তথ্য কেবল প্রবাহিত হবে না, বরং তা বিশ্লেষিত হবে, প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং প্রাসঙ্গিকতার আলোকে উপস্থাপিত হবে। এর অনুপস্থিতিতে তথ্য ধীরে ধীরে প্রভাবিত হয়ে পড়ে ক্ষমতার দ্বারা, সংবাদ পরিণত হয় প্রতিধ্বনিতে, এবং বাস্তবতা বিকৃত রূপে সামনে আসে। একই সাথে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা জবাবদিহিতার সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। একটি দায়িত্বশীল স্বাধীনতা গণমাধ্যমকে এমন একটি অবস্থানে দাঁড় করায়, যেখানে সে একদিকে ক্ষমতার ওপর নজরদারি করে, অন্যদিকে সমাজের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে, এবং একটি সংলাপমুখী পরিসর তৈরি করে, যেখানে মত, বিরোধ ও সত্য একসাথে সহাবস্থান করতে পারে।

লাবিবা সালওয়া ইসলাম
সাধারণ সম্পাদক, নিটার সাংবাদিক সমিতি (নিসাস)

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গণতন্ত্রকে  টেকসই ও শক্তিশালী করে:

গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ, সমাজের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহনে সহায়তা করাই গণমাধ্যমের প্রধানতম কাজ।
রাষ্ট্র এবং জনগণের মাঝে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করাও গণমাধ্যমের অন্যতম উদ্দেশ্য। রাষ্ট্র পরিচালনায় রাষ্ট্রযন্ত্র তথা সরকারকে সঠিক দিক নির্দেশনা প্রদান এবং সমাজের বিদ্যমান ব্যবস্থাকে জনকল্যাণমূখী করতেও গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এজন্যই গণমাধ্যমকে রাষ্টের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, ‘‘কোনো দেশে স্বাধীন গণমাধ্যম থাকলে সে দেশে দুর্ভিক্ষ হানা দিতে পারে না।’’
অপরদিকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ হলে সত্য গোপন থাকে এবং জনগণ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়, যা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। তাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী ও টেকসই রাখতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

রেফায়েত উল্যাহ রুপক
সভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (চবিসাস)

সাংবাদিকতা এখং বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি:

একটি রাষ্ট্রে সরকার ও জনগণের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনকারী প্রক্রিয়া হচ্ছে গণমাধ্যম। গণমাধ্যম গণমানুষের অধিকার এবং প্রয়োজনের কথা তুলে ধরে আবার অনিয়ম, দুর্নীতি, অবিচার তথা নেতিবাচক দিকগুলোর বিরুদ্ধে কলম ধরে নৈতিক এবং মানবিক একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এই প্রক্রিয়া তখনই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে যখন রাষ্ট্রে স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়। তবে আইনি জটিলতা, হুমকি-হেনস্তা এবং সংবাদমাধ্যমকে নিজস্ব স্বার্থে ব্যবহার করা স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে চিরাচরিত ঘটনা। গণমাধ্যম এখন সাংবাদিক হেনস্তা, নানামুখী চাপ এবং বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সাংবাদিকের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না গেলে তা ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র এবং গণমাধ্যম হুমকি স্বরূপ। স্বাধীনতা সার্বজনীন, তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণে সবার একসাথে কাজ করতে হবে। গণমাধ্যমকে স্বাধীনতা দিলে তা একটি গণতান্ত্রিক, সচেতন এবং ন্যায়ের রাষ্ট্র তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।

মোজাহিদুল নিরব
সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিত (গবিসাস)

আপনার পছন্দ হতে পারে