মিফতাহুল ইসলাম মাহিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:
“ও ভাই, আমরা চাই কাজ!ওসব ভাতা-ভুতা চাই না! সুস্থ মানুষের তুলনায় অর্ধেক বেতন দিক, সমস্যা নাই। কিন্তু আমরা কাজ করে খেতে চাই। আমাদের বেশি চাহিদা না।তিন বেলা ডাল-ভাত জুটলেই আমরা খুশি। কিন্তু মানুষ আমাদের দয়ারপাত্র ভাবে!”
চোখে কালো চশমা, হাতে সাদা ছড়ি, পেশায় বাদাম বিক্রেতা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা। এভাবে নিজের ক্ষোভের কথা বলছিলেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মোস্তফাকে হর-হামেশাই দেখা যায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। হাতে ছোট একটি প্লাস্টিকের ট্রে ফিতার দু মাথায় বেঁধে গলায় ঝুলিয়ে বাদাম, ছোলা, বুট ইত্যাদি ফেরি করে বেড়াই রাস্তায় রাস্তায়।
এখন থেকে বছর দশেক আগের কথা। ক্যাম্পাসে ভ্যান চালিয়ে ভালোই কাটছিল নতুন বিবাহিত জীবন। কিন্তু হঠাৎ করে চোখে জ্বালা যন্ত্রণা, চোখ দিয়ে পানি পড়া ও চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। চোখের এই অবস্থা নিয়ে প্রথমে শরণাপন্ন হয় রুপসা ব্রিজের উপর ক্ষুদের বটতলা চক্ষু হাসপাতাল তারপর ইস্পাহানি ইসলামিয়া হাসপাতাল। উভয় জায়গা থেকে ৩-৪ মাস ওষুধ খাওয়ার পর চোখের উন্নতির বদলে আরো অবনতি হতে থাকে। শেষে ডাক্তার জানায় চোখের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়া লাগবে। তারপর পরপর ৫ বার ভারতে যাওয়া, স্তরে স্তরে ঔষধ, টেস্ট ইত্যাদির পর তাকে জানোনো হলো ‘চোখ পরিবর্তন করা ছাড়া তাদের হাতে আর কোন বিকল্প নেই’। “ইতিমধ্যেই গোছানো টাকা শেষ!
ইন্ডিয়াতে চোখের অপারেশন এবং পরে রুটিন চেকআপের জন্য আরো প্রায় সাত- আট লাখ টাকার দরকার। এতো খরচ দেখে আর আগানো হয়নি!”
দীর্ঘশ্বাসের সাথে কথাগুলো বলেন মোস্তফা। দেশে এসে শুরু হয় আসল লড়াই। স্বার্থপর সম্পর্ক বনাম মোস্তফা! অসুস্থ হওয়ার পর মোস্তফা আশা করেছিল আপনজনরা তার ও তার স্ত্রীর পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু হয়েছে ঠিক বিপরীত।
মোস্তফা বলেন, “সান্ত্বনার বদলে আমার স্ত্রীকে আত্মীয়-স্বজনরা বলল আমাকে ছেড়ে দিতে। অনেকে এমনও বলেছে ‘ও তো এখন ভিক্ষা করে খাবে!’ এসব কথা এখনো কষ্ট দেয়। কন্ঠগুলো কানে বাজে!” এসবের উত্তরে তাঁর জেদি স্ত্রী মরিয়ম জানাই ‘আমি থাকতে মোস্তকে কখনো মানুষের দরজায় হাত পাত্তে দেব না!’এরপর থেকে স্ত্রী মরিয়মের হাত ধরেই বৃদ্ধ ভ্যানচালক পিতার ছয় সন্তানের বড় গোলাম মোস্তফা প্রায় ছয় সাত বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছে বাদাম বিক্রির ব্যবসা । সাদা ছড়িতে হাতে রাস্তা মেপে মেপে হাঁটা মোস্তফার কোনো দিন বিক্রি বাট্টা হয় আবার কোনো দিন ফিরতে হয় বউনি ছাড়ায়।
তাহলে কিভাবে চলে সংসার? হাসিমাখা মুখে মোস্তফা বলেন , “ক্যাম্পাসের কিছু কিছু কাস্টমার আছে যারা আমাকে নিয়ে ভাবে। দেখা হলে এমনি টাকা দিতে চাই কিন্তু সেটা আমি নেই না। তখন তারা বলে, মামা তাহলে দু প্যাকেট বাদাম নিচ্ছি ১০০ টাকা রাখেন !”
বিকাল চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভিতরে ঢুকে রাত অবধি এক প্যাকেট বাদামও বেচতে পারেননি । পকেটে রয়েছে মাত্র পাঁচ টাকা।হয়নি বাড়ি পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় গাড়ি ভাড়ার টাকাও।
প্রায় দুই বছর আগে এমনই কয়েকজন সহৃদয় মানুষের দেখা পেয়েছিলেন মোস্তফা। খুলনা পাবলিক কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসে ঘুরতে এসে মোস্তফা কে দেখে তার বাসায় যেয়ে তার স্ত্রী ও আশেপাশের মানুষের সাথে কথা বলে একটা দোকানের ব্যবস্থা করে দেয়। ঐ দোকান থেকে বেশ চলছিল মোস্তফার। দেড় বছর মত ক্যাম্পাসেও ফেরি করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিধিবাম! হঠাৎ মোস্তফার ভাই তাকে দুই বছরের মধ্যে বাড়ি ভাড়া বাবদ নব্বই হাজার টাকা যোগাড় করতে বলে। না হলে ছাড়তে হবে বাড়ি। বাড়ি ও দোকান বাঁচানোর জন্য আবার শুরু হয় সংগ্রাম।
সরকারি বেসরকারি সংস্থা থেকে সাহায্য সহযোগিতা পায় কিনা সেটা জানতে চাইলে গোলাম মোস্তফা বলেন, “এই এলাকায় আমি হয়তো একমাত্র অন্ধ যে ফেরি করে বাদাম বিক্রি করে। গল্লামারি, হল রোড, বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার মানুষ কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো সংস্থা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে আসেনি।আর সাহায্য সহযোগিতা বলতে সরকারী ভাতা বাবদ মাসিক ৭৫০ টাকা পাই।“
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বাদাম বিক্রেতাকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী আসিফ জামান বলেন, “ ক্যাম্পাসে আসার পর থেকেই ওনাকে দেখছি। একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও যে তিনি ভিক্ষা না করে সাবলম্বী হয়ে নিজের পরিবারের ভরণপোষণ করছেন এটা অনুপ্রেরণাদায়ক। প্রশাসনের উচিত তাকে সাহায্য করা ও পুনর্বাসন করতে এগিয়ে আসা।“