বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামোতে উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ২৭৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ১৮৯ জনেরই পিএইচডি ডিগ্রি নেই। মাত্র ৮৪ জন শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রিধারী রয়েছে, যা মোট শিক্ষকের ৩০ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, আইন বিভাগ এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে বর্তমানে কোনো পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক নেই।
সর্বোচ্চ সংখ্যক পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক রয়েছেন গণিত বিভাগে, যেখানে মোট ১০ জন শিক্ষক পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। এরপর বাংলা বিভাগে ৯ জন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ৮ জন এবং অর্থনীতি, লোক প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা শিক্ষা ও রসায়ন বিভাগে ৭ জন করে শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রিধারী।
এছাড়াও মার্কেটিং ও হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যব্যবস্থা বিভাগে ৫ জন করে জন, ইংরেজি ও আইসিটি বিভাগে ৪ জন করে এবং পরিসংখ্যান বিভাগে ৩ জন পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।
অন্যদিকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, ফার্মেসি এবং সিইএসি বিভাগে রয়েছেন মাত্র ২ জন করে পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক।
ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এম এম শরিফুল করিম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবশ্যই পিএইচডি ডিগ্রী থাকতে হবে। তবে, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন। একজন শিক্ষার্থী মাস্টার্স ডিগ্রী করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয় তখন তার বসয় হয়ে যায় ৩০ এর কাছাকাছি এবং তখন তার মধ্যে পারিবারিক দায়বদ্ধতা চলে আসে, যার কারণে তারা পিএইচডি করতে যায় না। এছাড়াও আমাদের দেশে পিএইচডি না করেও অধ্যাপক হওয়া যায়, একারণেও অনেকে পিএইচডি করতে যায় না। এখন যদি বলা হয় পিএইচডি ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে না তাহলে আগে পিএইচডির স্কোপ তৈরি করতে হবে। বিদেশে দেখা যায় গড়পড়তা সকলেই মাস্টার্স ডিগ্রী করে না, বরং যারা শিক্ষক হতে চায় তারাই মাস্টার্স ডিগ্রী করে৷ আর আমাদের দেশে সকলেই মাস্টার্স ডিগ্রী করে। সর্বোপরি আগে আমাদের সিস্টেমটা পরিবর্তন করতে হবে। ‘
মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার বলেন , ‘প্রত্যেক বিভাগে যদি অন্তত ৫০ শতাংশ শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রিধারী হন বা পিএইচডি অধ্যয়নরত থাকেন, তাহলে সেই বিভাগের ভাবমূর্তি ও শিক্ষার মান নিঃসন্দেহে উন্নত হয়। আমাদের শিক্ষকদের বিদেশে বা বাইরে গিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা উচিত। একটি প্রত্যাশিত সংখ্যক শিক্ষক যদি পিএইচডি না করেন, তাহলে তা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগের ভাবমূর্তির জন্য ইতিবাচক নয়। তবে আমি মনে করি, আদর্শভাবে প্রত্যেক শিক্ষকেরই পিএইচডি ডিগ্রি থাকা উচিত। পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা কম হলে বিভাগের একাডেমিক মান ও সনদের মূল্য তেমনভাবে বৃদ্ধি পায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাস্তবতার দিক থেকেও কিছু আর্থ-সামাজিক বিষয় রয়েছে। অনেক শিক্ষকের পরিবার পরিচালনার দায়িত্ব থাকে, পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও বিভিন্ন কাজ করে পিএইচডি করার সুযোগ পান না। তবুও শিক্ষকদের উচিত সুযোগ সৃষ্টি করে বাইরে গিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের চেষ্টা করা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সকল অধ্যাপকের পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে, অনেকে বর্তমানে পিএইচডি অধ্যয়নে বাইরে আছেন। তবে যারা প্রভাষক পদে রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে পিএইচডি করার সুযোগ থাকে না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনিস্টিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘পিএইচডি একটি গবেষণাভিত্তিক প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট কোনো সমস্যাকে কেন্দ্র করে গবেষণার পদ্ধতি অনুসরণ করে একটি ফলাফল নির্ণয় করা হয়, যা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে এবং সংশ্লিষ্ট জ্ঞানশাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একজন শিক্ষক পিএইচডি সম্পন্ন করলে তিনি যেকোনো বিষয়কে পদ্ধতিগত ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে চিন্তা ও বিশ্লেষণ করে তার ফলাফল উপস্থাপন করতে সক্ষম হন। ফলে অনুমাননির্ভর বক্তব্যের পরিবর্তে যুক্তিনির্ভর ও প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণের পার্থক্য তৈরি হয়। এটি চিন্তার গভীরতা ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি করে, এমন বহু গুণাবলি পিএইচডি গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকরা পিএইচডি ও গবেষণায় যুক্ত হলে তাদের বিষয়ভিত্তিক বিশেষ জ্ঞান আরও গভীর ও সমৃদ্ধ হয়। গবেষণার গুরুত্ব শুধু উচ্চশিক্ষায় নয়, বরং শিক্ষার সকল পর্যায়েই দেওয়া উচিত। তাতে নতুন জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন হয় এবং জ্ঞান সৃষ্টির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পথে পরিচালনা করা সহজ হয়। যেসব প্রতিষ্ঠানে এই বিষয়ের চর্চা কম, সেসব জায়গার কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, ‘শিক্ষকদের অবশই পিএইচডি ডিগ্রী থাকা উচিত। তবে, আমাদের যেসব শিক্ষক প্রভাষক পদে আছেন, তাঁদের প্রথম দুই বছর প্রবেশনারি পিরিয়ড হিসেবে গণ্য হয়। এ সময়কালে তাঁরা পিএইচডি করার ছুটি পান না। এছাড়া যারা সহকারী অধ্যাপক আছেন তাদের একটি বড় অংশ এখন পিএইচডি ডিগ্রিতে ভর্তি আছেন। আর যারা অধ্যাপক আছেন তাদের প্রায় সকলেরই পিএইডি আছে।’
কুবিতে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি শিক্ষকের নেই পিএইচডি ডিগ্রি