সংকটে জর্জরিত কুবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, একটি আসনে বসার লড়াইয়ে ৫৭ শিক্ষার্থী

by অনলাইন ডেস্ক
Site Favicon প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট ২০২৫ ১৭:০৫
A+A-
Reset

রাফি হোসেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেখানে রয়েছে আসন সংকট, বই সংকট, অব্যবস্থাপনাসহ নানান সীমাবদ্ধতা। প্রায় ৬ হাজার ৮৮৮ জন শিক্ষার্থীর জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ১২০টি আসন। ফলে প্রতিটি আসনের বিপরীতে গড়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ৫৭ জন। এ কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হয়ে দিনদিন লাইব্রেরি বিমুখ হয়ে পড়ছে।

লাইব্রেরি সূত্রে জানা যায়, লাইব্রেরিতে বর্তমানে প্রায় ২৭ হাজার বই থাকলেও নিয়মিত কোর্সের সব বই পাওয়া যায় না এবং বিশেষায়িত বইয়েরও রয়েছে প্রবল সংকট। নেই কোনো আন্তর্জাতিক জার্নাল, নেই ই-বুক অ্যাপস, নেই পর্যাপ্ত ডিসপ্লে সিস্টেম। শিক্ষকদের জন্য অ্যান্টি-প্ল্যাজারিজম সফটওয়্যারও চালু হয়নি এখনও।

লাইব্রেরি সূত্রে আরও জানা যায়, লাইব্রেরিতে ১৬টি টেবিল ভাগ করে তৈরি করা হয়েছে মাত্র ১২০টি আসন, যেখানে শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে বসতে হয়। এছাড়া, কম্পিউটার রয়েছে মাত্র ২০টি, যার মধ্যে ১টি নষ্ট। নেই কোন প্রিন্টার এবং ফটোকপি মেশিন।
শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাঝে মাঝে নির্দিষ্ট সেলফে প্রয়োজনীয় বই থাকে না। লাইব্রেরির মোট আসন মাত্র ১২০টি, যেখানে তাদেরকে (শিক্ষার্থীদের) গাদাগাদি করে বসতে হয়। কম্পিউটার যা রয়েছে তা শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক কম। এরমধ্যে কয়েকটিতে পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখারও অভিযোগ রয়েছে। গ্রুপ স্টাডির রুমে নেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি)।  সেই রুমে ফ্যান থাকলেও কয়েকটি ফ্যান আবার নষ্ট হয়ে আছে। ফলে গরমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ভোগান্তি হয়।

পাশাপাশি, লাইব্রেরিতে শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে মাত্র দুটি ওয়াশরুম, যা অপর্যাপ্ত। পানির ফিল্টারও কিছুদিন যাবৎ বিকল হয়ে আছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। অন্যদিকে, লাইব্রেরিতে আলাদা ঝাড়ুদার না থাকায় সপ্তাহে একবার ঝাড়ু দেওয়া হয়। ফলে লাইব্রেরির ভেতরে নিয়মিতভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকে না। এছাড়া কর্মকর্তাদের ফোনে কথা বলা ও লাইব্রেরির অভ্যন্তরে শিক্ষার্থীদের কথোপকথনের কারণে পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হয় বলেও অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা গাদাগাদি করে বসে পড়াশোনা করছেন। দুই চেয়ারের মাঝে ফাঁকা জায়গা না থাকায় কেউ উঠতে গেলে পুরো রুমে শব্দ ছড়িয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত বই ও প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাব, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি এবং বাজেট সংকট মিলিয়ে পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

এ নিয়ে পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুশফিকা জান্নাত বলেন, ‘আমাদের লাইব্রেরিতে প্রয়োজনীয় সব বই পাওয়া যায় না, যেটা বড় সমস্যা । অনেক সময় বই পাওয়া গেলেও, তা ভিন্ন লেখকের হয়। তাই আমাদের লাইব্রেরিতে প্রয়োজনীয় সব অ্যাকাডেমিক বইয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যেটি আমাদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করবে।’

বাংলা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী খাদিজা তুল তাহিরা বলেন, ‘লাইব্রেরি হলো জ্ঞানের ঘর। আমাদের বাংলা বিভাগের গবেষণা ক্ষেত্র, লাইব্রেরির বই নিয়ে আমাদের ভোগান্তির শেষ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে পর্যাপ্ত পরিমাণের বই নেই। বিশেষ করে, অ্যাকাডেমিক বইগুলো নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এখানে অল্প কিছু সংখ্যক বই থাকে, যার কারণে আমরা অনেক সমস্যায় পড়ছি।’

ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইসমাইল হোসাইন বলেন, ‘প্রশাসনিক ভবনের পাঁচ তলায় লাইব্রেরি হওয়ার কারণে সেখানে যাওয়া আসা একদিকে যেমন কষ্টসাধ্য অন্যদিকে সময় সাপেক্ষ। যার কারণে লাইব্রেরির প্রতি অনেকেই অনীহা প্রকাশ করে। নতুন করে গ্রুপ ডিসকাশনের অংশ চালু হলেও তা এত শিক্ষার্থীর তুলনায় অপ্রতুল।’

লোক প্রশাসন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান শাহিন বলেন, ‘প্রায় সময় দেখি আমরা লাইব্রেরি প্রবেশের পর ঝাড়ু দেওয়া হচ্ছে, এতে যাদের ধুলাবলির অ্যালার্জি তাদের জন্য এটি বড় সমস্যা। এখানে যারা কাজ করে তারা মোবাইলে ফোনে কথা বলে যেটি পড়ার পরিবেশ নষ্ট করে। একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি হিসেবে এখানে পর্যাপ্ত বই পাওয়া যায় না এটি সত্যি দুঃখজনক।’

এ বিষয়ে ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান মোঃ মহিউদ্দীন আলম বলেন, ‘আমাদের এখানে নানাবিধ সমস্যা আছে। এর যথেষ্ট কারণও আছে। বাজেট সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় সব বই নিয়ে আসতে পারতেছি না। এছাড়াও সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এখানে জায়গার অভাব। আমাদের যে বইগুলো আছে সেগুলোর রাখার মতো সেলফ নাই। সেলফ এনে রাখার মতো জায়গাও নাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘পানির ফিল্টারের যে সমস্যা সেটা দ্রুতই সমাধান করা হবে। আর আমাদের নিজস্ব কোনো ঝাড়ুদার না থাকায় এখানে একজন ঝাড়ু দিতে আসে সপ্তাহে মাত্র একদিন। সে কারণে অনেক সময় ঝাড়ু দিতে দেরি হয়ে যায়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ হায়দার আলী বলেন, ‘এখন আমাদের সবার কাছে ডিভাইস আছে, চাইলে অনলাইনে সবকিছুর উন্নত সংস্করণের বই পাওয়া যায়। অনলাইনে সর্বশেষ সংস্করণের বই এবং লেকচার শিট পাওয়া যায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ফ্রি ইন্টারনেট সুবিধা দিয়েছে-এটি ব্যবহার করে অনলাইন মেটেরিয়াল কাজে লাগিয়ে আমাদের এই নতুন সংস্কৃতিতে ফিরতে হবে। এই উন্নত উন্মুক্ত বিষয়গুলো পড়ে নিজেকে কতটা উপরে নিয়ে যাওয়া যায় এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ভালো কিছু করার চেষ্টা করছি, এখানে টাকা খরচ হয় ভুল জায়গায়; যা সঠিক জায়গায় করার কথা ছিল। আমরা ডিপার্টমেন্টকে বইয়ের তালিকা দিতে বলি, অনেকে দেয় আবার অনেকে দেয় না। শেষে ঘুরে ঘুরে পচা বইটাই নিতে হয়। আমাদের কোনো নীতিমালাও নেই যে আমরা ইউরোপ-আমেরিকা থেকে বই কিনব। আমরা অ্যান্টি-প্লেজিয়ারিজমের জন্য সফটওয়্যার কিনেছি, যার মধ্যে ১০০টি অ্যাকাউন্ট আছে। প্রতিটি বিভাগের জন্য ২টি করে এবং ২০টি কম্পিউটারের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলেছি।’

আসন সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লাইব্রেরিতে তেমন শিক্ষার্থী যায় না। এখন গিয়ে দেখুন লাইব্রেরিতে কয়জন আছে। এখন বেশিরভাগ শিক্ষার্থী লাইব্রেরিতে যায় পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস পরীক্ষায় প্রস্তুতির জন্য।’

আপনার পছন্দ হতে পারে