খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত

by অনলাইন ডেস্ক
Site Favicon প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট ২০২৫ ২৩:০১
A+A-
Reset

মিফতাহুল ইসলাম মাহিন , খুবি প্রতিনিধি

দক্ষিণবঙ্গের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠখ্যাত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি) প্রতিষ্ঠার ৩৪ বছরে এসে গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাপক উন্নতি সাধন করলেও আবাসন সংকট আছে চরমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী আবাসন বঞ্চিত থাকা স্বত্তেও বিগত বছরগুলোতে প্রশাসন থেকে আবাসন সংকট নিরসনে চোখে পড়ার মতো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। ফলশ্রুতিতে  নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীরাই সবথেকে বেশি অসুবিধায় পতিত হচ্ছে। তার ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তাদের পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭ হাজারের বেশি। কিন্তু সে তুলনায় হল রয়েছে মাত্র ৫টি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর তুলনায় হলের সংখ্যা কম হওয়ায়, আবাসন সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে যার ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট পাঁচটি হলে থাকছেন ২ হাজার ৪৭০ জন শিক্ষার্থী। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যে সংখ্যক নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়, তার তুলনায় আবাসন ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। সেই সঙ্গে বেড়ে চলেছে এর ভৌতসমস্যাও। শিক্ষার্থী ভর্তির সঙ্গে তাদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত না করায় আবাসন সংকট পৌঁছেছে চরমে।

আবাসন সুবিধা পান মাত্র ৩০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী। যার অর্ধেক এর বেশি  শিক্ষার্থীকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে ভাড়া বাড়ি ও মেসে থাকতে হয়। যার  কারনে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচের বাইরেও গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ।  নিরাপত্তাজনিত সমস্যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে হরহামেশাই।

এদিকে অনুসন্ধানের ভিত্তিতে  জানা গেছে, আবাসন সংকটের কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী মেস কিংবা বাসা ভাড়া করে থাকছেন। এরকম ১০-১৫ টি ছাত্রাবাসে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ৪-৫ বছর আগের তুলনায় বাসা ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ।   এই সংকট কাজে লাগিয়ে ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকাগুলোতে গড়ে উঠেছে মেস ও ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়ার রমরমা ব্যবসা। এসব মেস ও বাসায় প্রতিনিয়ত লোডশেডিং, বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্যানিটাইজেশন ব্যবস্থা না থাকায় অসহায় জীবন যাপন করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন হলে আসনসংখ্যা ৫৭৬। হলটিতে ২০ জন বিদেশি শিক্ষার্থী থাকেন। হলের ক্যানটিনের খাবারের মান নিয়ে পূর্বে তেমন কোনো অভিযোগ না থাকলেও বর্তমানে খাবার মান নিয়ে নানান অভিযোগ এবং সিট পেতেও বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়  বলে কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ডিসিপ্লিনের  চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রাসেল ইসলাম বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে আর্থিক সমস্যায় পড়তে হয়। বিশ্ববদ্যালয় প্রশাসন বারবার আশ্বাস দিয়েও এ সমস্যা নিরসনে কাজ করছে না। এসব আর্থিক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে আমাদের দিনভর টিউশন করাতে হয়, যারফলে একাডেমিক রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে পাশাপাশি নানান দুশ্চিন্তায় পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। প্রশাসনের প্রতি শিক্ষার্থীদের একটাই দাবি অতিদ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের  জায়গা বাড়িয়ে নতুন হল তৈরি করে এ সমস্যা নিরসণে পদক্ষেপ নিবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের খানজাহান আলী হলে ৪০৪ জন আবাসিক শিক্ষার্থী থাকেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এই হলের ক্যানটিনের খাবারের মান সন্তোষজনক নয়। ক্যান্টিন মালিকের কাছে বারবর অভিযোগ দিলেও এর কোনো সমাধান হয়নি বলে জানান শিক্ষার্থীরা। ওয়াশরুম এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক হওয়ায় শিক্ষার্থীরা শারীরিক এবং মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ডিসিপ্লিনের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমরান গাজী রিপন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকটের পাশাপাশি হল গুলো ডাইনিং ও ক্যানটিনের খাবার মান এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রতিনিয়ত খাবার খাওয়ায় গত জুলাই মাসে প্রায় ০৬ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল। এসময় ডাক্তাররা তার এ সমস্যা প্রধান কারণ হিসাবে অস্বাস্থ্যকর খাবারকে চিহ্নিত করে বলে জানান।

খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা হলে মোট আসনসংখ্যা ৩৮৪। স্বল্প আসনের এ হলগুলোতে রয়েছে নানান সমস্যা। শিক্ষার্থীরা বলছেন, এ হলে সহজে সিট পাওয়া যায় না । দ্বিতীয়বর্ষে খুবই অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী সিট পেলেও অনেকের সিট পেতে তৃতীয়বর্ষ বা তৃতীয়বর্ষের শেষ পর্যায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। যা শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা, আর্থিক বিষয়াদির পাশাপাশি সার্বিক দিকে প্রভাব ফেলে।

মেয়েদের অপরাজিতা হলে মোট আসন ৫৭৬টি। এ ছাড়া আছে ৭টি গণরুম। এসব রুমের ৪৮টি বেডে বর্তমানে  প্রায় ৬৫ জন মেয়েকে গাদাগাদি করে থাকতে হয়।

এ বিষয়ে তৃতীয়বর্ষের শিক্ষার্থী তামান্না জেরিন তমা বলেন, প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা যে কয়জন প্রথম বর্ষেই সিট পান, তাঁদের আট থেকে দশ মাস গণরুমে থাকতে হয়। তবে, নতুন প্রশাসন গনরুম নিরসণের কাজ শুরু করেছেন।

এছাড়াও মেয়েদের বিজয়-২৪ হলে মোট আসন সংখ্যা ৮৬৪ টি। যা মোট ছাত্রীদের সংখ্যা বিবেচনায় তুলনামূলকভাবে অনেকটায় কম বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের ভাড়া বাড়ি বা মেসে থেকে আসা-যাওয়া করেন। তাঁদের অনেকেই বলেছেন, বাড়ি ও মেসের ভাড়া, খাবারের দাম অনেক বেড়ে গেছে। খরচ জোগাতে গিয়ে তাঁদের হিমশিম খেতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে কত দিন চালিয়ে যেতে পারবেন তা তারা জানেন না।

আবাসনজনিত সমস্যা নিরসণের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জানান,  “শিক্ষার্থীদের আবাসনের সংকট নিরসণের জন্য নতুন হল তৈরি করা হবে। তবে জায়গা সঙ্কটের কারনে নতুন হল তৈরি করা যাচ্ছেনা। ক্যাম্পাসের জায়গা বর্ধিত হলে পরবর্তীতে পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।”

আপনার পছন্দ হতে পারে