বিকেলের সোনালী রোদ যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল ইটের দালানগুলোয় দীর্ঘ ছায়া ফেলে, চারপাশটা যেন কিছুটা মায়াবী হয়ে ওঠে। ক্লাস-পরীক্ষার ক্লান্তি শেষে শিক্ষার্থীরা যখন হলের পথে ফেরেন, তাঁদের হাতে দুলতে থাকে ইফতারের ব্যাগ। ঘর ছেড়ে আসা হাজারো তরুণের কাছে রমজান মানে কেবল সংযম নয়; এ এক অন্যরকম পরম মমতার গল্প, এক নতুন ‘পরিবার’ খুঁজে পাওয়ার দিনলিপি।
সবুজ ঘাসে ঘেরা এই ক্যাম্পাসে ইফতারের থালায় হয়তো মায়ের হাতের সব পদের স্বাদ মেলে না, কিন্তু সেখানে মিশে থাকে সহপাঠীদের অকৃত্রিম ভালোবাসা।
বারান্দার আড্ডায় ইফতার
বিকেল গড়াতেই আবাসিক হলগুলোর বারান্দা বা ছাদে চেনা আড্ডাগুলো আরও জমে ওঠে। কেউ পরম মমতায় ছোলা মাখাচ্ছেন, কেউবা প্লাস্টিকের মগে বরফ ঢেলে বানাচ্ছেন লেবুর শরবত। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের একাকিত্ব ভুলিয়ে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মোশাররফ হোসেন হলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিম মোরশেদ জানান, “বাড়িতে থাকলে হয়তো এখন মা আমার পছন্দের পদগুলো নিয়ে সামনে বসে থাকতেন। শুরুতে খুব খারাপ লাগত, কিন্তু গত তিন বছরে হলটাই আমার পরিবার হয়ে গেছে। গামলায় মুড়ি মাখিয়ে বন্ধুদের সাথে ভাগ করে খাওয়ার যে তৃপ্তি, তা ক্যাম্পাস ছাড়লে খুব মিস করব। এই যে একসাথে মিলেমিশে থাকা, নামাজ শেষে আড্ডা দেওয়া, এটাই তো ক্যাম্পাস জীবনের আসল সার্থকতা।”
পরীক্ষার চাপেও স্নিগ্ধতা
ক্যাম্পাসে রমজান মানে যে কেবলই আড্ডা, তা কিন্তু নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডারের চাপে রোজা রেখেও ক্লাস-পরীক্ষা কিংবা দীর্ঘ সময় ল্যাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের। তবে দিন শেষে ক্যাম্পাসের শান্ত পরিবেশ তাঁদের মনে এক চিলতে প্রশান্তি এনে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৯তম আবর্তনের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান শোনালেন তাঁর সংগ্রামের কথা। তিনি বলেন, “রোজা রেখে দুপুরে যখন ক্লাস বা প্রেজেন্টেশন থাকে, সত্যি খুব ঝক্কি পোহাতে হয়। মাঝেমধ্যে মনে হয় বাড়িতে থাকলেই হয়তো ভালো হতো। কিন্তু ইফতারের পর সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে যখন বন্ধুদের সাথে একটু বসি, হিমেল হাওয়ায় সব ক্লান্তি যেন নিমেষেই ধুয়ে যায়। জাহাঙ্গীরনগরের এই রাতগুলো আমাদের ধৈর্য ধরতে শেখায়।”
সেহরির ভোরে প্রাণবন্ত বটতলা
রমজানে জাবির রাতগুলো কোনোভাবেই ম্লান হয় না। ঘড়ির কাঁটা রাত তিনটা ছুঁইছুঁই করলেই হলের ডাইনিংগুলোতে শুরু হয় প্লেট-বাটির টুংটাং শব্দ। জাবির বিখ্যাত ‘বটতলা’ কিংবা হলের সামনের ছোট দোকানগুলোতে তখন শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড়।
ক্যাম্পাসে এটিই প্রথম রমজান ৫৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদের। নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রথমবার পরিবার ছাড়া রোজা রাখা নিয়ে একটু শঙ্কায় ছিলাম। কিন্তু বড় ভাইরা যেভাবে মাঝরাতে টেনে তুলে সেহরি করতে নিয়ে যান, তাতে একাকীত্ব বোধ করার সুযোগই পাই না। সিনিয়র-জুনিয়র এই অটুট সম্পর্কই ক্যাম্পাস জীবনকে সুন্দর করে তুলেছে।”
সবুজের ছায়া আর লেকের জলে ঘেরা জাহাঙ্গীরনগরের এই রমজান যাপন শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে থাকে আজীবন। অভাব-অনটন বা পরীক্ষার দুশ্চিন্তা ছাপিয়ে একসাথে রোজা রাখা আর মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াই এই ক্যাম্পাসের রমজানের চিরকালীন রূপ।