বিশ্বে কোথায় কোন ভাষা সবচেয়ে বিপন্ন?

আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার

by অনলাইন ডেস্ক
Site Favicon প্রকাশিত: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৩
A+A-
Reset

১৮৬টি দেশের প্রায় দেড়শ’ কোটি মানুষ ইংরেজি ভাষায় কথা বলে। তবে এ বিপুল সংখ্যার মাত্র ২০ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা ইংরেজি; বাকি ৮০ শতাংশের জন্য এটি দ্বিতীয়, তৃতীয় বা তারও পরের ভাষা

বিশ্বে বর্তমানে ৭ হাজারেরও বেশি ভাষা প্রচলিত। তবে এর মধ্যে অন্তত ৩ হাজার অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ ভাষা বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ভাষার বৈশ্বিক চিত্র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এ তথ্য। একদিকে কিছু ভাষা কোটি কোটি মানুষের মুখের ভাষা হয়ে প্রভাব বিস্তার করছে, অন্যদিকে হাজারও ভাষা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি কথিত ভাষা

ভাষা-তালিকাভিত্তিক ডেটাবেজ এথনোলোগের তথ্য মতে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভাষা ইংরেজি। ১৮৬টি দেশের প্রায় দেড়শ’ কোটি মানুষ ইংরেজি ভাষায় কথা বলে। তবে এ বিপুল সংখ্যার মাত্র ২০ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা ইংরেজি; বাকি ৮০ শতাংশের জন্য এটি দ্বিতীয়, তৃতীয় বা তারও পরের ভাষা।

দ্বিতীয় সর্বাধিক কথিত ভাষা মান্দারিন চীনা, প্রায় ১২০ কোটি মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। তবে চীনের বিশাল জনসংখ্যার কারণে মাতৃভাষাভাষীর সংখ্যা বিবেচনায় এটি বিশ্বের বৃহত্তম ভাষা। তৃতীয় স্থানে রয়েছে হিন্দি (৬০ কোটি ৯০ লাখ বক্তা), এরপর স্প্যানিশ (৫৫ কোটি ৯০ লাখ) ও স্ট্যান্ডার্ড আরবি (৩৩ কোটি ৫০ লাখ)।

বিশ্বের জনপ্রিয় ভাষার লিপি

বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা লেখার জন্য ব্যবহৃত গ্রাফিক চিহ্নের সমষ্টিকে বলা হয় লিপি বা স্ক্রিপ্ট। বৈশ্বিক লিপি-সংক্রান্ত রেফারেন্স গ্রন্থ দ্য ওয়ার্ল্ডস রাইটিং সিস্টেম অনুযায়ী, র্তমানে পরিচিত লিপির সংখ্যা ২৯৩টি।

এর মধ্যে ১৫৬টিরও বেশি লিপি এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে ১৩৭টির বেশি ঐতিহাসিক লিপি এখন আর প্রচলিত নয়। বিলুপ্ত লিপির মধ্যে রয়েছে প্রাচীন মিসরের ইজিপশিয়ান হায়ারোগ্লিফস ও মেসো-আমেরিকার অ্যাজটেক পিক্টোগ্রামস ।

বর্তমানে সবচেয়ে বিস্তৃতভাবে ব্যবহৃত লিপি হলো লাতিন লিপি । ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, জার্মানসহ অনেক ভাষা এ লিপিতে লেখা হয়। বিশ্বের ৭ হাজার ১৩৯টি জীবিত ভাষার অন্তত ৩০৫টিতে লাতিন লিপি ব্যবহৃত হয়। বৈশ্বিক জনসংখ্যার ৭০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এ লিপি ব্যবহার করেন।

অন্যদিকে ইজিপশিয়ান হায়ারোগ্লিফস ও অ্যাজটেক পিক্টোগ্রামসের মতো ১৩৭টিরও বেশি ঐতিহাসিক লিপি এখন আর ব্যবহৃত হয় না।

কত ভাষা বিপন্ন?

বিশ্বে বর্তমানে ৭ হাজার ১৫৯টি ভাষা প্রচলিত। এর মধ্যে: ৩ হাজার ১৯৩টি (৪৪ শতাংশ) বিপন্ন, ৩ হাজার ৪৭৯ (৪৯ শতাংশ) স্থিতিশীল আর ৪৮৭টি (৭ শতাংশ) প্রাতিষ্ঠানিক। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক বলতে বোঝায় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে এসব ভাষার প্রচলন রয়েছে।

কোনো ভাষা তখনই বিপন্ন হয়ে পড়ে, যখন তার ব্যবহারকারীরা পরবর্তী প্রজন্মকে মাতৃভাষার পরিবর্তে অধিক প্রভাবশালী ভাষা শেখাতে শুরু করেন। অনেক ক্ষেত্রে বিপন্ন ভাষা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে সীমিতভাবে টিকে থাকে।

এথনোলোগের তথ্যানুযায়ী, ৩৩৭টি ভাষা ‘ডরম্যান্ট’ বা সুপ্ত। অর্থাৎ এর কোনো দক্ষ বক্তা নেই, কিন্তু ভাষাটি এখনো কোনো জাতিগোষ্ঠীর সামাজিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে টিকে আছে। আরও ৪৫৪টি ভাষা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত—যার কোনো বক্তা নেই এবং কোনো সামাজিক ব্যবহারও নেই।

বর্তমানে প্রায় ৮ কোটি ৮১ লাখ মানুষ বিপন্ন ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন। বিস্তারিত হিসেবে:

১ হাজার ৪৩১টি ভাষায় মাতৃভাষাভাষীর সংখ্যা ১ হাজারের কম
৪৬৩টি ভাষার বক্তা ১০০-এর কম
১১০টি ভাষায় কথা বলে মাত্র ১০ জন মানুষ
মাত্র ২৫টি দেশে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ বিপন্ন ভাষার বাস। অঞ্চলভিত্তিক বিবেচনায় ওশেনিয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন ভাষা রয়েছে, এরপর এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা।

অঞ্চলভিত্তিক কিছু বিপন্ন ভাষা

ওশেনিয়া
অস্ট্রেলিয়ায় ইউগামবেহ একটি বিপন্ন আদিবাসী ভাষা। এটি প্রধানত গোল্ড কোস্ট, সিনিক রিম ও লোগান অঞ্চলে ইউগামবেহ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবহৃত হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পুনরুজ্জীবন কর্মসূচি ও শেখার অ্যাপ ব্যবহারের ফলে ভাষাটি তরুণ প্রজন্মের কাছে ভাষাটি কিছুটা সহজলভ্য হয়েছে।

এশিয়া

জাপানের আইনু ইতাক একটি চরমভাবে বিপন্ন ভাষা। ইউনেস্কোর মতে, এটি নিশ্চিতভাবে কোনো ভাষা-পরিবারের সঙ্গে যুক্ত করা যায় না। ২০০৬ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, ২৩ হাজার ৭৮২ জন আইনু জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ৩০৪ জন ভাষাটি জানেন। বক্তার সঠিক সংখ্যা অজানা।

আফ্রিকা

ইথিওপিয়ায় অঙ্গোটা একটি চরম বিপন্ন ভাষা। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ওয়েইতো নদীর পশ্চিম তীরে একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এ ভাষায় কথা বলত। বর্তমানে সম্প্রদায়ের সদস্য প্রায় ৪০০, যার মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন প্রবীণ ভাষাটি বলতে পারেন।

আমেরিকা
উত্তর ও মধ্য আমেরিকায় প্রায় সব আদিবাসী ভাষাই বিপন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে লুইজিয়ানা ক্রেওল একটি গুরুতর বিপন্ন ভাষা। ফরাসিভিত্তিক এ ক্রেওল ভাষায় আফ্রিকান ও আদিবাসী প্রভাব রয়েছে এবং এটি মূলত প্রবীণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

বলিভিয়ায় প্রচলিত লেকো একটি বিপন্ন ও বিচ্ছিন্ন ভাষা। অর্থাৎ অন্য কোনো ভাষার সঙ্গে এর জিনগত সম্পর্ক নেই। লেকো জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ হলেও ভাষাটি এখন শুধু প্রবীণদের মধ্যে টিকে আছে।

ইউরোপ
ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রচলিত কেরনেউয়েক একসময় ইউনেস্কোর তালিকায় বিলুপ্ত ভাষা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। পরবর্তীতে পুনরুজ্জীবনের ফলে ২০১০ সালে এর মর্যাদা ‘বিপন্ন’ করা হয়। ২০২১ সালের ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের আদমশুমারি অনুযায়ী, ৫৬৩ জন মানুষ এ ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করে।

ঢাকা পোস্ট অবলম্বনে

আপনার পছন্দ হতে পারে