ভিন্ন ধর্মের তরুণ–তরুণীর প্রেম, ‘অনার কিলিং’: কী ঘটেছিল ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামে

by অনলাইন ডেস্ক
Site Favicon প্রকাশিত: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৩:২২
A+A-
Reset

ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের একটি ছোট গ্রামে বছরের পর বছর ধরে বাসিন্দারা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছিলেন। সেখানে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের এক প্রেমিক জুটির হত্যাকাণ্ড এবং অভিযুক্ত খুনিদের গ্রেপ্তারের ঘটনা পুরো গ্রামকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে।

গত ২১ জানুয়ারি পুলিশ উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদ জেলার উমরি গ্রামের কাছে একটি নদীর তীর থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধার করে। সেগুলো মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল।
মরদেহ দুটি ১৯ বছর বয়সী কাজল এবং ২৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ আরমানের। কাজল হিন্দু এবং আরমান মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। পুলিশের ভাষ্য, দুই ধর্মের অনুসারী এ দুই তরুণ–তরুণী ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন।

পুলিশ জানায়, মৃতদেহ উদ্ধারের দুই দিন আগে পিটিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়। পুলিশের সন্দেহ, কাজলের তিন ভাই এ কাজ করেছেন। পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করেছে। তাঁরা পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। এখন পর্যন্ত তিন ভাই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মুখ খোলেননি।

রাজধানী দিল্লি থেকে ১৮২ কিলোমিটার দূরের গ্রাম উমরিতে এ হত্যাকাণ্ডে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এসেছে। গ্রামটিতে প্রায় চার শ পরিবার বসবাস করে। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থান রয়েছে।
গ্রামের একাধিক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেছেন, তাঁদের গ্রামে বছরের পর বছর ধরে পরস্পরের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে এবং এখানে ধর্মীয় বিরোধের কোনো ইতিহাস নেই।

রাজ্য পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল মুনিরাজ জি বিবিসিকে বলেন, পুলিশ এ ঘটনাটিকে ‘অনার কিলিং’ হিসেবে দেখছে।
সাধারণত পরিবারের সদস্য বা সম্প্রদায়ের লোকজন জাতি বা ধর্মের বাইরে গিয়ে কাউকে বিয়ে করলে শাস্তি দিতে তাঁদের হত্যা করলে এটাকে ‘অনার কিলিং’ বলা হয়।

ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (এনসিআরবি) ২০১৪ সাল থেকে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের রেকর্ড রাখা শুরু করেছে। সে বছর সারা দেশে ১৮টি ঘটনা তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।
২০২৩ সালের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এমন ৩৮টি ঘটনা তালিকাভুক্ত হয়েছে।
তবে মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। প্রতিবছর ‘অনার কিলিংয়ের’ শতাধিক ঘটনা ঘটে। এ রকম অনেক ঘটনাই কেবল হত্যাকাণ্ড হিসেবে রেকর্ড করা হয়।

উমরিতে কী ঘটেছিল
উমরি ভারতের উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদ জেলায় অবস্থিত। গ্রামটি ধাতু শিল্পের জন্য পরিচিত। মূলত গ্রামীণ এই অঞ্চলে জাত–পাত ও শ্রেণিবৈষম্য এখনো দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
উমরি গ্রামের বাসিন্দা কাজলের ভাইয়েরা মোরাদাবাদ শহরে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
গ্রামের বাসিন্দা মহিপাল সাইনি জানান, তাঁদের গ্রামে কাজল ও আরমানের সম্পর্কই প্রথম দুই ভিন্ন ধর্মের জুটির ঘটনা ছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উমরির এক বাসিন্দারা বিবিসিকে বলেন, কাজল ও আরমান প্রতিবেশী ছিলেন। মাত্র ২০০ মিটারের ব্যবধানে তাঁদের বাড়ি ছিল। তাঁরা দুজনই অন্তর্মুখী ছিলেন, খুব বেশি মানুষের সঙ্গে মিশতেন না।

এ ঘটনার পর উমরি গ্রামে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কাজল উমরির একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। আর আরমান প্রায় পাঁচ মাস আগে সৌদি আরব থেকে গ্রামে ফিরেছিলেন। আরমান চার বছর সৌদি আরবে ছিলেন। তিনি সেখানে একটি খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে কাজ করতেন।
আয় ভালো না হওয়ায় দেশে ফিরে আসেন এবং একটি পাথর ভাঙার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছিলেন।
কীভাবে কাজল ও আরমানের পরিচয় হয়েছে বা তাঁদের মধ্যে কত দিন ধরে সম্পর্ক, সে বিষয়ে পুলিশ কিছু বলতে পারেনি। তবে বলেছে, তাঁরা দুজন ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
বাসিন্দাদের ধারণা, খুব সম্ভবত ১৮ বা ১৯ জানুয়ারির রাতে কাজলদের বাড়িতেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সেদিন কাজলের ভাইয়েরা আরমানকে কাজলের কাছে যেতে দেখেছিলেন।

কাজলের তিন ভাই রাজারাম, সতিশ ও রিঙ্কু সাইনি কারাগারে রয়েছেন। তাঁরা এখন পর্যন্ত নিজেদের পক্ষে কিছুই বলেননি।

তাঁদের বাবা গণপত সাইনি বিবিসিকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি এবং তাঁর স্ত্রী বাড়িতে ছিলেন না। তাঁরা গ্রামের কাছে একটি চালায় ঘুমাচ্ছিলেন। সাধারণত গৃহপালিত প্রাণীদের পাহারা দিতে তাঁরা বেশির ভাগ রাত সেখানেই ঘুমান। মেয়ের মৃত্যুতে তাঁরা শোকাচ্ছন্ন।
আরমানের বড় ভাই ফারমান আলী বলেন, মা–বাবার জন্য ওষুধ কেনার কথা বলে গত ১৮ জানুয়ারি রাতের খাবার খাওয়ার পর তাঁর ভাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। সকাল পর্যন্ত তিনি আর ফিরে আসেননি। তাঁর ফোনও বন্ধ ছিল। এতে আতঙ্কিত হয়ে তাঁরা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে গ্রামে তল্লাশি অভিযান শুরু করে।
পুলিশ জানায়, কাজলের ভাইয়েরা ২০ জানুয়ারি বোনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ দায়ের করে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। তাঁদের অভিযোগ ছিল, আরমান তাঁদের বোনকে অপহরণ করেছে।
পুলিশ উভয় পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কাজলের ভাইয়েদের বিবৃতিতে অসংগতি দেখতে পায়।

তদন্ত করতে করতে পুলিশ নদীর তীরে পৌঁছায় এবং সেখানে মাটির নিচ থেকে কাজল ও আরমানের মৃতদেহ উদ্ধার করে।
গণপত সাইনি বলেন, ১৯ জানুয়ারি সকালে তিনি ও তাঁর স্ত্রী বাড়ি ফেরার পর কাজলকে বাড়িতে পাননি। তিনি দাবি করেন, মৃতদেহগুলো খুঁজে পাওয়ার পর তিনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানতে পারেন।
কাজল ও আরমানের প্রেম নিয়ে তিনি বা তাঁর পরিবারের কেউ আগে থেকে কিছু জানতেন কি না, এ প্রশ্নের জবাব দেননি গণপত।
তবে আরমানের পরিবার বলেছে, কাজলের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তাঁরা কিছু জানতেন না।
ফরমান আলী বলেন, ‘সে (আরমান) কখনো আমাদের কিছু বলেনি। পুরো এক দিন ধরে যখন আমরা তাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তখন তার কয়েকজন বন্ধু আমাদের বলেছিল, দুই মাস ধরে তাকে কাজলের সঙ্গে দেখা যাচ্ছিল।’

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

আপনার পছন্দ হতে পারে