৫৬ বছরে পা দিলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 

Site Favicon প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৩১ আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ ১৫:৩১
A+A-
Reset
প্রকৃতির কোলঘেঁষা লাল মাটির পথ, জলাশয় ভরা অতিথি পাখির ডানা ঝাপটানো আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) আজ এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করছে। গৌরব আর ঐতিহ্যের ৫৫টি বসন্ত পেরিয়ে দেশের একমাত্র আবাসিক এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আজ পা রাখলো ৫৬ বছরে। ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি যে বিদ্যাপীঠের যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র ১৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে, আজ তা হাজারো প্রাণের স্পন্দনে মুখরিত এক বিশাল পরিবার।
​পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে এর গোড়াপত্তন। শুরুতে নাম ছিল ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’, যা ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়’। প্রখ্যাত রসায়নবিদ ড. মফিজ উদ্দিন আহমদের হাত ধরে অর্থনীতি, ভূগোল, গণিত আর পরিসংখ্যান—এই চারটি বিভাগ নিয়ে যে চারাগাছটি রোপণ করা হয়েছিল, আজ তা ৩৪টি বিভাগ ও ৪টি ইনস্টিটিউটের এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
​বিজ্ঞান ও গবেষণায় নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে ক্যাম্পাসে নির্মিত হয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ ‘ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র’। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য ছেলেদের ১১টি ও মেয়েদের ১০টি আবাসিক হল এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত হচ্ছে অত্যাধুনিক বহুতল বিশিষ্ট আবাসিক ভবন। সবুজ গাছপালায় ঘেরা লাল ইটের এই ক্যাম্পাস যেন বছরের পর বছর এক টুকরো ‘ভূ-স্বর্গ’ হিসেবে টিকে আছে।
​জাবি মানেই মুক্তবুদ্ধির চর্চা। কেউ কেউ একে ভালোবেসে ডাকেন ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সেই গ্রিক আদলের মুক্তমঞ্চ থেকে শুরু করে ‘অমর একুশ’ কিংবা ‘সংশপ্তক’—ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ যেন কথা বলে। সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিকে অমলিন রাখতে এখানে নির্মিত হয়েছে দেশের প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ ‘অদম্য ২৪’, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের লড়াকু মানসিকতারই পরিচয় দেয়। শুধু সংস্কৃতি নয়, সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রতি বছর এখানে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় ‘প্রজাপতি মেলা’ ও ‘পাখি মেলা’।
​৫৫ বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় সাফল্যের মুকুটে অনেক পালক জমলেও শিক্ষার্থীদের মনে কিছু আক্ষেপ রয়েই গেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে এসেও প্রশাসনিক কাজে ‘এনালগ’ পদ্ধতি বা অটোমেশনের অভাব শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রেজাল্ট বা ফরম পূরণের জন্য এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘোরার সেই পুরোনো চিত্র আজও বদলায়নি। রয়েছে চিকিৎসা কেন্দ্রের সীমাবদ্ধতাও। পর্যাপ্ত ওষুধ আর আধুনিক সরঞ্জামের অভাবে জরুরি প্রয়োজনে সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আবার অনেক বিভাগেই শিক্ষার্থীদের সংখ্যার তুলনায় ক্লাসরুম বা ল্যাবের সংকট রয়ে গেছে।
​জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার মদদদাতা হিসেবে অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিচার প্রক্রিয়া মন্থর গতিতে চলায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ কাজ করছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, বিচার প্রক্রিয়া চলমান এবং কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ আশার বাণী শুনিয়েছেন যে, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো শেষ হলে আবাসন ও ক্লাসরুমের সংকট দ্রুতই সমাধান হবে।
​আজকের দিনটি শুধুই উদযাপনের। সকাল সাড়ে ৯টা থেকেই ‘মৃৎমঞ্চে’ জড়ো হতে শুরু করেন বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। পতাকা উত্তোলন, শোভাযাত্রা, গান আর বিকেলের প্রীতি ফুটবল ম্যাচে মেতে উঠবে পুরো ক্যাম্পাস। রাতে জাকসু’র বর্ণিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজন।
​শীতের এই সকালে সাইবেরিয়া থেকে আসা পরিযায়ী পাখিরা যেমন জাবির জলাশয়ে আশ্রয় খুঁজে নেয়, তেমনি দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা জাবিয়ানরাও এই দিনে ফিরে আসেন তাদের প্রিয় ঠিকানায়। মেধা, মনন আর দ্রোহের এই চত্বর আরও বহু বছর এভাবেই আলো ছড়িয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।

আপনার পছন্দ হতে পারে