গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের বিচার দাবিতে উত্তাল ক্যাম্পাস

Site Favicon প্রকাশিত: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:১৭
A+A-
Reset

সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের (গবি) আইন বিভাগের এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল পুরো ক্যাম্পাস। প্রশাসনের দীর্ঘদিনের উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে শিক্ষার্থীরা।

বৃহস্পতিবার ( ৪ ডিসেম্বর) বেলা ১১টায় ছাত্রী ধর্ষণ মামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—গকসু ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে উদাসীনতা ও দায় এড়ানোর অভিযোগ তুলে দ্রুত বিচার এবং প্রক্টোরিয়াল বডি পুনর্গঠনের দাবি জানান।

এাময় বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন—‘বাহ্ ভিসি চমৎকার, ধর্ষকদের পাহারাদার’, ‘ধর্ষকদের ঠিকানা, এই ক্যাম্পাস হবে না’, ‘অন্তুরদের চামড়া তুলে নিব আমরা’, ‘ফাঁসি চাই, ধর্ষকদের ফাঁসি চাই’, ‘বিচার চাই, রিমন দালালের বিচার চাই’, ‘এক দফা এক দাবি, ভিসি তুই বাহির হবি’।

পরে ১১টা ৪৫ মিনিটে আন্দোলনকারীরা আইন বিভাগে গিয়ে শিক্ষক লিমন হোসেনের পদত্যাগ দাবি করেন। এ সময় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক রায়হান খান বলেন, “আপনার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ। আমরা সবাই চাই আপনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে চলে যান।”

শিক্ষার্থীরা বলেন, “ধর্ষকের ফাঁসি চাই, প্রক্টোরিয়াল বডির পদত্যাগ চাই, লিমন হোসেনকে চাকরিচ্যুত করতে হবে। বিচার না হলে ভিসির পদত্যাগ চাই।”

গকসুর সমাজ কল্যাণ ও ক্যান্টিন সম্পাদক মনোয়ার হোসেন অন্তর প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বলেন, “প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার কারণে আইন বিভাগের অন্তু এত সাহস পেয়েছে। তিনি হলেন ভিসি স্যার। সুষ্ঠু টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ক্যান্টিনের দায়িত্ব অন্য একজন পেলেও ফার্মেসি বিভাগের সিহাব, সম্রাট ও আইন বিভাগের অন্তু তা বন্ধ করতে চেয়েছিল। আমি ভিসি স্যারকে বললে তিনি আমাকে বলেন—‘অন্তর, তুমি ওদের সঙ্গে নেগোসিয়েশনে যাও।’ অথচ অন্তু ক্যান্টিন মালিকের কাছে এক লাখ টাকা চেয়েছে এবং আমাকেও টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এর সঙ্গে আমি কিভাবে নেগোসিয়েশন করি?”

তিনি আরও বলেন, “এমন একজন শিক্ষক যদি প্রশাসনের প্রধান হন, বিশ্ববিদ্যালয় ঠিকভাবে চলতে পারে না। তিনি আমার সংসদের প্রধান হলেও তার পদত্যাগ দাবি করছি। তিনি চলে গেলে সংসদ ভেঙে গেলেও আপত্তি নেই।”

সাম্প্রতিক র‍্যাগিং ইস্যু নিয়েও তিনি ভিসির ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, “র‍্যাগিং প্রতিবেদনে যৌন হেনস্তার বিষয় উল্লেখ নেই—জিজ্ঞেস করলে ভিসি স্যার বলেন, ‘প্যান্ট খোলার কথা বলা হয়েছিল কিন্তু খোলেনি।’ অথচ ভুক্তভোগী নিজেই যৌন হেনস্তার কথা বলেছে। প্রতিবেদন থেকে এই অংশ বাদ গেলো কীভাবে? তখন ভিসি স্যার আমাকে বলেন—‘এসবের জবাব আমি তোমাকে দিতে বাধ্য নই।’”

গকসুর সাধারণ সম্পাদক রায়হান খান বলেন, “আমরা ছাত্রদের ভোটে নির্বাচিত। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রয়োজনে জীবনের বিনিময়ে হলেও আমরা সেই দায়িত্ব পালন করব।”

তিনি আরও বলেন, “আইন বিভাগের ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনার দায় প্রশাসন এড়াতে পারে না। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে। তদন্ত করলে দেখা যাবে—অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা এ ঘটনায় জড়িত। এটা লুকানোর সুযোগ নেই।”

প্রক্টোরিয়াল বডির প্রতি ক্ষোভ জানিয়ে রায়হান বলেন, “আপনাদের মেরুদণ্ড সোজা না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপদ হবে না। দায়িত্ব পালন করতে না পারলে ছেড়ে দিন। নতুন, শক্তিশালী প্রক্টোরিয়াল বডি গঠন করতে হবে এবং ধর্ষণের শিকার শিক্ষার্থীকে সব ধরনের সহায়তা দিতে হবে। এমন শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যেন ভবিষ্যতে কোনো ছাত্রীকে নিয়ে হাসাহাসির সাহস কেউ না পায়।”

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “এখন ব্যবস্থা না নিলে শিক্ষার্থীরা এমনভাবে নড়িয়ে দেবে যে দাঁড়ানোর জায়গা থাকবে না।”
রায়হান আরও বলেন—“বিচার না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস, পরীক্ষা ও কর্মসূচি বর্জন থাকবে।”

গকসুর সহ–সভাপতি (ভিপি) ইয়াসিন মৃদুল দেওয়ান জানান, “আমার বোন ৭ মাস আগে আইন বিভাগের বিভাগীয় চেয়ারম্যানকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিল, কিন্তু কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। রফিকুল স্যারকে বলছি—সব শিক্ষার্থীর সামনে সেই লিখিত অভিযোগটি পড়ে শোনাবেন এবং একই কাগজের অন্য পাশে আপনার পদত্যাগপত্র লিখে আনবেন। এই ঘটনায় বিচার না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।”

এর আগে, গতকাল আশুলিয়া থানায় এক ছাত্রী পিকনিকের কথা বলে ডেকে নিয়ে গণধর্ষণ, ভিডিও ধারণ ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। গ্রেপ্তার চারজন হলেন—দেলোয়ার ভূঁইয়া (২৬), তাজুল ইসলাম তাজ (২৩), শ্রাবণ সাহা (২৩) ও অন্তু দেওয়ান (২৮)। তাঁরা গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থী।

এজাহার অনুযায়ী, গত ৭ এপ্রিল অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীকে অচেতন করে ধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ করে। পরে বিভিন্ন সময় হুমকি দিয়ে তাঁর কাছ থেকে ৯৬ হাজার টাকা আদায় করে। ৬ নভেম্বর তাঁকে আবার আটকে রেখে শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করতে চায়। এতে রাজি না হলে মারধর করা হয় এবং নেশাজাতীয় পানীয় খাওয়ানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আপনার পছন্দ হতে পারে