17
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বেশ কিছু নাম রয়েছে যাদের অবদান স্বাধীনতার সংগ্রামকে শুধু ত্বরান্বিতই করেনি বরং এক নতুন দিক-নির্দেশনা দিয়েছিল। তাঁদের অন্যতম ছিলেন মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, (বীর উত্তম)। একজন সাহসী ও দেশপ্রেমিক সেনানায়ক, সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত মেধাবী পরিকল্পনাকারী। তাঁর জীবন, কর্মকাণ্ড ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
খালেদ মোশাররফ ১৯৩৭ সালের ৯ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল হাফিজ ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং মাতা আফরোজা খালেদ ছিলেন সমাজসেবিকা। ১৯৫৫ সালে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং কাকুলে অবস্থিত (পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি) থেকে সফলভাবে প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৫৭ সালে কমিশন লাভ করেন।
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তিনি সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন এবং সামরিক দক্ষতার পরিচয় দেন। কিন্তু ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর গণহত্যা শুরু হলে তিনি বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেন। মার্চের শেষ দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা দেখে তিনি বাঙালি সেনাদের সংগঠিত করতে থাকেন। অবশেষে ২৫ মার্চের পর তাঁর ইউনিটের অধিকাংশ সদস্য সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যায় এবং সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।
ভারতের আগরতলায় পৌঁছে তিনি মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর কাজী নূরুজ্জামান সহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের সাথে মিলিত হয়ে পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ০২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন, যার আওতায় ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ফরিদপুর জেলার অংশবিশেষ অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাঁর নেতৃত্বে এই অঞ্চলে একের পর এক সফল গেরিলা অভিযান পরিচালিত হয়।
খালেদ মোশাররফের কৌশলগত নেতৃত্বের ফলে মুক্তিবাহিনী সীমান্তবর্তী এলাকায় শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করতে সক্ষম হয় এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহ ব্যাহত হয়। তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী শুধু আক্রমণাত্মক কৌশলই নয়, যুদ্ধকৌশলে প্রশিক্ষিত এক কার্যকর গেরিলা ইউনিটে পরিণত হয়। তিনি শুধু একজন আদর্শ সেনানায়ক ই ছিলেন না, ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের সৈনিকদের পাশে, কখনও নিরাপদ দূরত্বে নয়।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে যখন ভারতীয় মিত্রবাহিনী মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ শুরু করে, তখন খালেদ মোশাররফের বাহিনী কুমিল্লা অঞ্চল থেকে ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত গেরিলা অভিযানের ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন এবং সামরিক বাহিনীর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
তবে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক ষড়যন্ত্রের ভেতরেও তিনি পেশাদার সৈনিক হিসেবে দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর তিনি এক রক্তপাতহীন সেনা অভ্যুত্থান পরিচালনা করে ক্ষমতা দখল করেন, এবং সামরিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর এই উদ্যোগ বেশিদিন টেকেনি। মাত্র তিন দিন পর, ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে এক পাল্টা অভ্যুত্থানে শহীদ হন হতভাগা এই সেনানায়ক।
তাঁর মৃত্যু ছিল বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়। যিনি মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন, কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র চার বছর পর হতভাগ্য এই সেনানায়ক কে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে প্রাণ হারাতে হলো। তাঁর সহযোদ্ধা খন্দকার নাজমুল হুদা ও এ.টি.এম হায়দারকেও একই দিনে হত্যা করা হয়।
মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের জীবন ও সংগ্রাম শুধু এক ব্যক্তির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, শৃঙ্খলা, সাহস ও দেশপ্রেমের প্রতীক। তাঁর সততা, দেশপ্রেম, ও নৈতিক দৃঢ়তা আজও বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। ১৯৭১ সালে তিনি যে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অমর দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশ সরকার বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করে। খালেদ মোশাররফ ছিলেন সেই মানুষ, যিনি প্রমাণ করেছিলেন; একজন সত্যিকারের সৈনিকের সর্বোচ্চ দায়িত্ব হলো দেশের প্রতি আনুগত্য, জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা, এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান।
লেখক: ইরফান ইবনে আমিন পাটোয়ারী, শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।