ক্ষমতায় থাকাকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পাস ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক থেকে শুরু করে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, ডিশ ব্যবসায়ী, জন প্রতিনিধিকে মারধর, চাঁদাবাজি, তুলে এনে মুক্তিপণ আদায়, ভিন্ন মতাবলম্বীকে মারধর, নিয়োগ বোর্ডে বাধা ও উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিল ছাত্রলীলের নেতা-কর্মীদের নাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১২ বছরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা নিজেদের মধ্যে কতবার সংঘর্ষ, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়েছে এর প্রকৃত হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত মোট ১২ বছরে অন্তত তিন শতাধিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে।
আর নিজেদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সংঘর্ষে জড়িয়েছেন অন্তত ২৫ বার। এর মধ্যে ছাত্রলীগের অন্তত ২৫০ নেতা-কর্মী বিভিন্ন সময় আহত হয়েছেন। এসব কর্মকাণ্ডে কালেভদ্রে কয়েকটি ঘটনায় বিচার হলেও বেশিরভাগ ঘটনায় বিচার হয়নি।
ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুনের ঘটনাও ঘটেছিল। ২০১২ সালে পূর্ব ঘটনার জের ধরে ছাত্রলীগ কর্মী জোবায়েরকে পিটিয়ে মেরে ফেলে তৎকালীন উপাচার্য শরীফ এনামুল কবীরের মদদপুষ্ট ছাত্রলীগের একটি গ্রুপের নেতা-কর্মীরা। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে তীব্র আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় আইনে মামলা হয়। জোবায়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৫ জনের ফাঁসির আদেশ হয়। যদিও তাদের মধ্যে চারজনই পলাতক।
গত ১২ বছরে ছাত্রলীগের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্ব দিয়েছেন ছয় নেতা। নেতা বদলালেও পরিস্থিতি একই রয়েছে, সেটি সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনাই প্রমাণ করে। এদের মধ্যে খোদ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটনের (পলাতক) বিরুদ্ধে রয়েছে ছিনতাইয়ের অভিযোগ।
২০২৩ সালের উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের সহসভাপতি সাদিয়া আফরিনকে রসায়ন বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগ না দেওয়ায় উপাচার্য মো. নূরুল আলমকে দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। ওইদিন এক ইন্সটিটিউটের শিক্ষক নিয়োগের ভাইবা থাকলেও সেখানে ভাইবা দিতে আশা চাকরি প্রার্থীদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁদের বিরুদ্ধে। পরে প্রশাসন সেদিন নিয়োগ বোর্ড স্থগিত করে।
একই বছরের ১৩ আগস্ট সাভারের একটি বাসা মালিকের সাথে কথা-কাটাকাটির জেরে ছাত্রলীগের উপ-তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক জাহিদ আল ইমনকে মওলানা ভাসানী হলের ১২৬ নম্বর কক্ষে নিয়ে পেটে পিস্তল ঠেকিয়ে, বেধড়ক মারধর করে ও শরীরে মদ ঢেলে মাদকাসক্ত প্রমাণ করতে উল্লাস করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের ছোটভাই আরমান খান যুব। রাজনৈতিকভাবে বিচার না পেয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। পরে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ইমেইলের মাধ্যমে উপাচার্য বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সে বছরের ৭ জুন আবাসিক হল থেকে অছাত্রদের বের করে দেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে ছয় দিন ধরে অনশনে থাকা শিক্ষার্থী সামিউল ইসলাম প্রত্যয়ের উপর হামলা করে ছাত্রলীগের উপসাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক গৌতমের নেতৃত্বে কয়েকন নেতা-কর্মী। হামলাকারীরা সামিউলের বিছানায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় স্যালাইন রাখার স্ট্যান্ড ভাঙচুর করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী শিক্ষার্থীরা বাধা দিতে চাইলে ছাত্রীসহ কয়েকজনকে মারধর করা হয়।
একই বছরের ২৫ জুলাই সাভার থেকে আশুলিয়া রুটে চলাচলকারী লেগুনা থেকে দৈনিক ২৫ টাকা হারে চাঁদা দাবি করে ২৪টি লেগুনা ক্যাম্পাসে আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল ফারুক ইমরান, শাহ পরাণ ও হাসান মাহমুদ ফরিদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, লেলিন মাহবুব এবং উপছাত্র-বৃত্তিবিষয়ক সম্পাদক আল- রাজি সরকারের বিরুদ্ধে। তবে ছাত্রলীগ নেতাদের দাবি ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা লেগুনাগুলো আটকে রেখেছিলেন।
১৪ জুলাই এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্তের জেরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল ও শহীদ রফিক-জব্বার হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২০জন আহত হয়। সংঘর্ষের শুরুটা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে হলেও পরে ছাত্রলীগের কর্মীরা এ ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে।
একই বছরের ১৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাঙামাটি এলাকার বাসিন্দা ফরিদ হোসেনকে বাসা থেকে তুলে এনে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সাব্বির হোসেন, সাজ্জাদ শোয়াইব চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান, অর্থ সম্পাদক মো. তৌহিদুল ইসলাম এবং উপ-ছাত্রবৃত্তিবিষয়ক সম্পাদক আলরাজী সরকারের বিরুদ্ধে।
১ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী ডিশ ব্যবসায়ী মমিনউল্লাহর কাছে দাবি করা পাঁচ লাখ টাকা না পেয়ে লাইনম্যান খায়রুলকে ক্যাম্পাসে এনে মারধরের অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের উপদপ্তর সম্পাদক হাসিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। ৫ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী ইসলামনগর বাজারে এক জুতার দোকানদার ও তাঁর কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি সাব্বির হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদি হাসানের বিরুদ্ধে। ৬ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ্ববর্তী পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনোয়ার হোসেনকে তুচ্ছ ঘটনায় মারধরের অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে।
৮ ফেব্রুয়ারি শহীদ সালাম-বরকত হলে এক বহিরাগতকে মারধর ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে উঠে পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক অসিত পালের বিরুদ্ধে।
২২ মার্চ মীর মশাররফ হোসেন হল ছাত্রলীগ কর্তৃক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল ছাত্রলীগের এক নেতাকে রড দিয়ে মাথা ফাটানোর ঘটনা ঘটে। গত ২৬ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক রিফাত চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ের এম্বুলেন্স (ঢাকা মেট্রো ছ ৭১-৪৫৪৫) ব্যবহার করে মাদক পরিবহনকালে সাভারের বিপিএটিসি এলাকায় এম্বুলেন্সের সঙ্গে একটি রিকশার সংঘর্ষ ঘটে। এই ঘটনায় রিক্সাচালক ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ চারজন আহত হন।
এবছরের ৪ জানুয়ারি চাঁদা দাবি করে আল-বেরুনী হল সংলগ্ন খেলার মাঠের উন্নয়ন কাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠে ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মো. এনামুল হক এনাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরাফাত ইসলাম বিজয় ও সাংগঠনিক সম্পাদক চিন্ময় সরকারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে।
০২ জানুয়ারি বান্ধবীকে ‘অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির’ অভিযোগকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের সহসম্পাদক আওলাদ মিয়াকে মারধর করার অভিযোগ উঠে ছাত্রলীগের উপ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক সবুজ রায়ের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্রক্টরের কাছে অভিযোগ দেন আওলাদ।
২০২২ সালের কর্মকাণ্ড:
২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর ফুটবল খেলায় রেফারির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আ ফ ম কামালউদ্দিন হল ও মওলানা ভাসানী হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। দুই হলের ছাত্রলীগ নেতারা এই মারামারির ঘটনায় নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগ।
২০২২ সালের ৬ আগস্ট খেলার মাঠে ছাত্রলীগের এক কর্মীর গায়ে ধাক্কা লাগার জের ধরে মীর মশাররফ হোসেন হল ও মওলানা ভাসানী হলের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে মারামারি হয়। এ সময় বটতলার দুটি দোকানে ভাঙচুরও চালানো হয়। এ ঘটনায় সাতজনকে সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় গ্রামবাসীর সংঘর্ষ হয়। ঘটনার শুরুটা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের একটি ম্যাচকে কেন্দ্র করে হলেও পরে জানা যায় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজক কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম কাজুকে জিম্মি করে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী সদস্য পিয়াস ইজারদার ও সাংগঠনিক সম্পাদক অভিষেক মণ্ডল। তাঁরা টাকার দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলামকে মেসে তুলে নিয়ে যান। পরে তাঁকে উদ্ধার করতে গিয়ে ছাত্রলীগের নেতাদের মারধর ও মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেন গ্রামবাসী। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গ্রামবাসী সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে যা শেষ পর্যন্ত ক্ষতক্ষয়ী সংঘাতে রুপ নেয়। এতে অন্তত ৩৫ জন আহত হয়।
চলবে….