দুর্গাপূজার আনন্দে মুখর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা

Site Favicon প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর ২০২৫ ২০:৪৫
A+A-
Reset

রাফি হোসেন, কুবি

বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে দেশজুড়ে নেমেছে উৎসবের বর্ণিল আমেজ। দেবী দুর্গার আগমনে শহরাঞ্চল থেকে গ্রামাঞ্চল সবখানেই পূজামণ্ডপগুলো সেজেছে নানান থিম ও শৈল্পিক প্রতিমায়। ঢাক-ঢোলের শব্দ, শঙ্খধ্বনি,ধূপ-ধুনোর গন্ধ আর আলোকসজ্জায় ভরে উঠেছে চারদিক। পূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি এখন বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরাও এই উৎসবের আবহে ভিন্ন এক আবেগে ভাসছেন। কেউ ফিরে গেছেন আপন নীড়ে, কেউ থেকে গিয়েও পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে ভাগ করে নিচ্ছেন আনন্দ। বছরের পড়াশোনা আর ব্যস্ততার ফাঁকে এই কয়েকটি দিন তাদের কাছে নতুন করে বাঁচার মতো, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মিশে যাওয়ার মতো। শুধু পূজামণ্ডপ নয়, প্রতিটি ঘর, প্রতিটি উঠান, পাড়ার মোড়ের প্রতিমা সবকিছুই যেন নতুন করে প্রাণ পেয়েছে প্রিয়জনের পদচারণায়। দুর্গাপূজা তাদের শেকড়ে ফেরায়, ভালোবাসার টান জাগায় আর মিলনমেলায় একত্রিত করে।

আইন বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী  কেয়া দেবনাথ বলেন, ‘৩৬৫ দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মায়ের দেখা মেলে মাত্র ৫ দিনের জন্য। পূজোর ২-৩ মাস আগে থেকে কত হাজার প্ল্যানিং, কেনাকাটা। যখন ছোট ছিলাম তখন তেমন আনন্দ না করতে পারলেও সময়ের সাথে সাথে পূজোর ৫ দিন খুব মজা হয়। পরিবার,  আত্মীয়- স্বজন, প্রিয় মানুষের সাথে ভালে মুহূর্ত কাটানো হয়। পূজোর দিন সাজগোজ, খাওয়া দাওয়ায় দিনগুলো চোখের পলকের সাথেই কেটে যায়। মায়ের বিদায়ের পরে আবারো দিন গুনা শুরু হয়। মায়ের কাছে শুধু এইটুকুই প্রার্থনা পুরো বিশ্বের সবাইকে সুস্থ শরীর দান করুক এবং পৃথিবী ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বেঁচে থাকার অনুকূল করুক।’

নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অর্নব সরকার বলেন, ‘শারদীয় দুর্গা পূজা হলো বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। এ সময় দুর্গা মা অসুর নিধন করে শুভ শক্তির বিজয় ঘোষণা করেন।এ উৎসব মিলন, ভ্রাতৃত্ব ও আনন্দের প্রতীক। এইবারের শারদীয় দুর্গা পূজা আমার জন্য আনন্দমুখর হয়ে উঠেছে। সকালে প্রতিমা দর্শন ও চণ্ডীপাঠ শুনে মন ভরে যায়। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো, নতুন পোশাক পরা আর আলোকসজ্জা দেখা এ এক অন্য রকম অনুভূতি । সন্ধ্যায় ধুনুচি নাচ, আরতি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। পরিবারের সঙ্গে প্রণাম, প্রসাদ খাওয়া ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আড্ডা পূজার আনন্দকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। সার্বিকভাবে আমার পূজা আনন্দ, মিলন ও ভালোবাসায় ভরপুর কাটছে ।’

ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইশা মন্ডল গায়েত্রী বলেন, ‘ এবারের দুর্গাপূজা আমার জীবনে একটু ভিন্নভাবে এসেছে। ঠাকুমার মৃত্যুর কারণে পরিবারে শোকের আবহ ছিল, তাই উৎসবে সম্পূর্ণভাবে অংশ নিতে পারিনি। মণ্ডপে যাওয়া বা অঞ্জলি দেওয়ার সুযোগ হয়নি, শুধু একদিন আত্মীয়দের সঙ্গে মন্দিরে গিয়েছিলাম। বেশিরভাগ সময় বাড়িতে বসেই ফোনে বিভিন্ন মণ্ডপের সাজসজ্জা দেখেছি। সব মিলিয়ে এবারের পূজা ছিল অনেকটা নিঃশব্দ ও নিরব। তবে আগের বছরের পূজার আনন্দ-ভরা স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায় একসাথে অঞ্জলি দেওয়া, প্রসাদ খাওয়া, ছবি তোলা, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে ঘোরা। ছোটবেলায় নতুন জামা পড়ে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ফুচকা, চকলেট খাওয়া ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দ। নবমীতে মণ্ডপে ঘোরা ছিল এক নিয়মিত উচ্ছ্বাস। শৈশবের পূজা ছিল প্রাণচঞ্চল কোলাহলে ভরা, আর এখনকার পূজা হয়ে উঠেছে স্মৃতিময় আর আবেগঘন। এবারে সরাসরি পূজায় অংশ নিতে না পারলেও, পুরোনো স্মৃতিগুলোই মন জুড়িয়ে দিয়েছে।’

অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অন্তু দাশ বলেন, ‘সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। এটি শুধু পূজা বা  উৎসব নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, ঐক্য আর আনন্দের প্রতীক। শরতের আকাশ, কাশফুল আর ঢাকের শব্দ জানান দেয় মা আসছেন। ঘরে ফিরছেন উমা, সঙ্গে করে আনছেন আশার আলো আর ভালোবাসা। দুর্গাপূজা শুধু দেবীর আরাধনা নয়, এটি আমাদের এক  গভীর আবেগ অনুভূতির নাম। এই অনুভূতির জন্য অধীর আগ্রহে ৩৬৫ দিন অপেক্ষা করি, কবে বছর ঘুরে আবার মা আসবেন। দুর্গাপূজা আমাদের আবেগ ও মিলনের উৎসব। পরিচিত-অপরিচিত সবাই একত্রিত হয়ে আনন্দে মেতে উঠি। কয়েকটা দিনের জন্য মানুষ ভুলে যায় বিভেদ আর দুঃখ-কষ্ট। মণ্ডপে আলো, ধুনুচি নাচ আর আরতির ছন্দে তৈরি হয় এক স্বর্গীয় পরিবেশ।দেবী দুর্গা শুধু অসুর দমন করতে আসেন না, তিনি আসেন আমাদের মনকে শুদ্ধ করতে ও ভালোবাসায় এক করতে। ‘

তিনি আরও বলেন, ‘দেবী দুর্গা কৈলাশ থেকে থেকে মর্তে  আসেন শুধু মন্দ দমন আর শুভ প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, তিনি আসেন আমাদের হৃদয়কে এক করার জন্য। আজ মহা নবমী আগামীকাল শুভ বিজয়া শুভ বিজয়া দশমীর মধ্যে দিয়ে মাতৃ আরাধনার শুভ সমাপ্তি হবে। আগামীকালকের পর থেকে আবারও শুরু হবে মায়ের আগামী আমনের দিন গণনা। পূজা শেষে মা বিদায় নেন, কিন্তু রেখে যান তাঁর ভালোবাসা, শান্তি আর সাহস যা সারাবছর আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। মায়ের কাছে একটাই প্রার্থনা, মন্দের বিনাশ ও সৎ শক্তির জয় হোক। মানুষের মধ্যে থাকা অসুরভাবের বিনাশ হোক, মানুষ আবার মনুষ্যত্বপূণ মানুষ হয়ে উঠুক। পৃথিবীর সর্বত্র শান্তি ফিরে আসুক।  ওঁম শান্তি। ওঁম শান্তি। ওঁম শান্তি।’

আপনার পছন্দ হতে পারে