কাঞ্চনজঙ্ঘার ছোঁয়া: দার্জিলিংয়ে হারিয়ে যাওয়ার গল্প

by অনলাইন ডেস্ক
Site Favicon প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২৫ ০৫:৫০ আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২৫ ০২:২৮
A+A-
Reset

পাহাড শব্দটার মধ্যেই আছে এক রহস্যময় টান। আর যদি সেই পাহাড় হয় কাঞ্চনজঙ্ঘা, তাহলে তার সৌন্দর্য প্রকাশের জন্য কোনো শব্দই যথেষ্ট নয়।

২০২২ সালের ডিসেম্বর। শীত তখন বাংলাদেশে মোটামুটি, কিন্তু হিমালয়ের পাদদেশে তার রূপ যে কেমন, সেটা জানার তীব্র ইচ্ছে নিয়ে কয়েকজন বন্ধু মিলে রওনা দিলাম। যশোরের বেনাপোলের সীমান্তে ঠাসা ঠাসা ভিড়, ইমিগ্রেশন পেরিয়ে পৌঁছাই কলকাতায়। সেদিন রাতেই শিয়ালদহ স্টেশন থেকে চেপে বসলাম দার্জিলিং মেইল ট্রেনে। জানালার ওপার অন্ধকার, আর আমার বুকের ভেতর আলো – স্বপ্নের শহর দার্জিলিং দেখব, কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখব!
ভোরে পৌঁছালাম নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। তখনও ঘুম ভাঙেনি ভালো করে, এরমধ্যে স্টেশনের বাইরে নেমেই দালালদের ভিড়। কোথায় যাব, কার কাছে যাব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শেষে একটা গাড়ি রিজার্ভ করে রওনা দিলাম দার্জিলিংয়ের দিকে।

সেই রাস্তা! বড় বড় পাইন গাছের সারি, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ, মাঝে মাঝে মেঘের চাদর। যেন সিনেমার কোনো দৃশ্য। কখনো মনে হচ্ছিল, গাড়িটা আকাশে উড়ছে। পাহাড়ের গায়ে গায়ে ছোট ছোট ঘরবাড়ি, দূরে উঁকি দেয় কাঞ্চনজঙ্ঘা – স্বপ্নিল, রহস্যময়।

বিকেলে যখন পৌঁছালাম দার্জিলিং, তাপমাত্রা তখন ৭-৮ ডিগ্রি। ঠাণ্ডার কামড় গায়ে লাগতেই শিহরন জেগে উঠল। হোটেল ঠিক করলাম এমন জায়গায়, যেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। ফ্রেশ হয়ে বের হলাম শহরটা ঘুরতে। মল মার্কেট, রাস্তার মোড়ে মোড়ে সাজানো দোকান, অস্ট্রালয়েড মুখাবয়বের হাসিমাখা মানুষগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিলো – আমি কোনো এক সিনেমার সেটে চলে এসেছি।

রাতের ঠাণ্ডায় মোমো খাওয়ার মজাই আলাদা। কেএফসি থেকে শুরু করে স্ট্রীট ফুড, যা পেয়েছি সব ট্রাই করেছি। দার্জিলিংয়ে এসে মোমো না খেলে সত্যিই সব বৃথা। রাতে চাদর, জ্যাকেট আর হাতের গ্লাভস কিনে পরদিনের জন্য গাড়ি ঠিক করে ফিরে এলাম হোটেলে।

পরদিন ভোরে রওনা দিলাম টাইগার হিলে। তাপমাত্রা তখন আরও নিচে, সঙ্গে কনকনে বাতাস। কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘাকে সোনালী রঙে রাঙাতে সূর্য উঠতে শুরু করল যখন, মনে হলো, চোখের সামনে এক নতুন পৃথিবী খুলে গেল। সূর্যের লাল আভায় কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন লাজুক বউয়ের মতো সোনালী শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তটা ক্যামেরায় বন্দি করলাম, কিন্তু মন জানে – এই সৌন্দর্য কোনো ছবিতে আটকে রাখা যায় না।

এরপর গেলাম রক গার্ডেন। পাহাড়ি রাস্তা ধরে পৌঁছালাম সেই জায়গায়। ঝরনার শব্দ, পাথরের ভাঁজে ভাঁজে সবুজের ছোঁয়া। বন্ধুরা চলে গেল উঁচুতে, আর আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুধু শুনছিলাম – পাহাড়ের নীরবতা। এরপর গেলাম চা বাগানে। হ্যাপি ভ্যালি টি গার্ডেন – নামের মতোই সে জায়গা সুখে ভরিয়ে দিল মন। পাহাড়ের ঢালে ঢালে সাজানো চা গাছ, পেছনে সাদা বরফে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা। মনে হলো, জীবনে আর কিছু চাইবার নেই।
ফিরে আসার পথে ঢুঁ মারলাম বৌদ্ধ মোনেস্ট্রিতে। শান্ত, নির্জন এক জায়গা। প্রার্থনার ঘণ্টাধ্বনি শুনে মনে হলো, জীবনটা বড় বেশি অস্থির হয়ে গেছে আমাদের। মোনেস্ট্রির শান্তি যেন বলল, ‘থেমে দাঁড়াও, নিজের ভেতরের কথাগুলো শোনো।’

রাতের বেলায় হোটেলের বেলকনিতে বসে দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর উপরে চাঁদকে একসাথে দেখছিলাম। ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছিল মুখের ওপর দিয়ে। জীবনের সব ক্লান্তি, দুঃখ, ব্যর্থতা যেন এক নিমিষে মিলিয়ে গেল। শুধু ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা, চাঁদ আর আমি।

শেষ দিন টয়ট্রেনে ঘুরলাম। বাতাসিয়া লুপ দিয়ে ট্রেন যাচ্ছিল, আর দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন হাসিমুখে তাকিয়ে বলছিল, “আবার এসো।” এরপর গেলাম দার্জিলিং মিউজিয়াম আর জু। প্রথমবারের মতো ব্ল্যাক প্যান্থার আর স্নো লেপার্ড দেখলাম। মিউজিয়ামে শেরপাদের এভারেস্ট জয়ের সরঞ্জাম দেখে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। কী অদম্য সাহসের মানুষ তারা!

দার্জিলিংয়ের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মুগ্ধতার। পাহাড়ি রাস্তা, মেঘে ঢাকা ঘরবাড়ি, মানুষের মিষ্টি ব্যবহার – সবই মন ছুঁয়ে গেছে। বারবার যেতে ইচ্ছে করে। বাংলাদেশের যেকোনো ভ্রমণপ্রেমী কম খরচে এই স্বপ্নের জগৎ থেকে ঘুরে আসতে পারেন। শুধু যেতে হবে খোলা মন আর চোখ নিয়ে। কারণ পাহাড় কখনো কাউকে খালি হাতে ফেরায় না।
লেখক: ইজাজ আহমেদ শাওন
শিক্ষার্থী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার পছন্দ হতে পারে